রাকিবুল হাসান আহাদ, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মোঃ হুমায়ুন কবির খানের বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ না করার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে তিনি একজনের জমির দাগ, পরিমাণ ও মৌজা নম্বর পরিবর্তন করে আরেকজনের নামে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন দিচ্ছেন। এতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ জমির মালিকরা, কেউ কেউ হারাচ্ছেন পৈত্রিক সম্পত্তিও। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের বিনিময়ে এক মৌজার জমি অন্য মৌজায় দেখিয়ে নতুন দাগ সৃষ্টি করাও তার নিত্যদিনের কাজ। তবে চাহিদামতো টাকা পেলে সঠিক মৌজার জমির ওপরও প্রতিবেদন দিতে দেখা যায় তাকে। এতে করে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ছেন নাগরিকরা। ভুক্তভোগীরা জানান, ময়মনসিংহ সদর বিভাগীয় জেলার প্রধান নগরী হওয়ায় এখানে জমি কেনাবেচার চাহিদা বেশি। জমি ক্রয়ের আগে খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মৌজা যাচাই করে সার্ভেয়ারের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক। এই প্রতিবেদনের সুযোগকে পুঁজি করে আগেভাগেই মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন সার্ভেয়ার হুমায়ুন কবির খান। অভিযোগ রয়েছে, তার একটি সক্রিয় দালাল চক্র রয়েছে, যারা ভূমি অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ে মধ্যস্থতা করে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে মাসের পর মাস ঘুরানো হয় সেবাগ্রহীতাদের। আবার অনেক ক্ষেত্রে ঝামেলাযুক্ত জমির বিষয়ে একজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে অন্যজনের পক্ষে প্রতিবেদন দিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে প্রকৃত মালিক তার জমি হারাচ্ছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ সদরে যোগদানের আগে হুমায়ুন কবির খান ফুলবাড়িয়া উপজেলা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তার ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন সেবাগ্রহীতারা। অভিযোগের মুখে সেখান থেকে বদলি হয়ে সদর উপজেলায় এলেও অল্পদিনেই একই কায়দায় ঘুষ বাণিজ্যে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মৌজা সঠিক থাকা সত্ত্বেও জমির পরিমাণ বুঝে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে বছরের পর বছর প্রতিবেদন আটকে রাখা হয়। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঘুষ দিতে রাজি হচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে বা বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়, এমনকি জমি হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। একাধিক জমি মালিক অভিযোগ করে বলেন, নিজেদের উপস্থিতি ছাড়াই তাদের জমির শুনানিতে ক্রেতার পক্ষে প্রতিবেদন দিয়ে জমি হাতছাড়া করা হয়েছে। চুরখাই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘ঘুষ না দিলে বলা হয় জমির কাগজে সমস্যা আছে। টাকা দিলে সব ঠিক, না দিলে মাসের পর মাস হয়রানি। গত দুই বছর ধরে এভাবে মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন তিনি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী জানান, তার জমির ফাইল প্রায় আট মাস ধরে সার্ভেয়ারের কাছে পড়ে আছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্দেশ দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় আজও প্রতিবেদন পাননি তিনি। এদিকে সাধারণ মানুষের এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না অভিযুক্ত সার্ভেয়ার মোঃ হুমায়ুন কবির খান। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সূত্র জানায়, এর আগেও হালুয়াঘাট ও ফুলবাড়িয়া উপজেলা ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত হন হুমায়ুন কবির খান। সেখানকার সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের মুখে একাধিকবার বদলি হন তিনি। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায় বলে জানা গেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এমন অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।