
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের কর্পোরেট সম্পদ লুটের সবচেয়ে বড় ঘটনা নাসা গ্রুপের আলোচিত বিষয়ে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে গ্রুপটির ভাইস চেয়ারম্যান ও তার আইনজীবী ভাইয়ের বিরুদ্ধে। নাসা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার ও তাঁর ভাই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খোরশেদ আলম খন্দকারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব বিষয়ে অনেকেই মন্তব্য করলেও চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ পরিচয় প্রকাশ করার সাহস পাননি।
প্রথম পর্যায়: ব্যবসায়িক বিপর্যয় থেকে সুপরিকল্পিত লুটপাট: ২০২৪ সালের অক্টোবরে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যানের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই ব্যবসায়ীক সংকটের সূচনা। তার আটকের সাথে সাথে ক্রেতাদের তাৎক্ষণিক প্রস্থান ঘটে।
দুজন নিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কার্যক্রম বজায় রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু চেয়ারম্যানের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া ক্রেতাদের আস্থা বিলুপ্ত হয়। তখন ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। সুযোগ বুঝে তিনি সুশৃঙ্খল অবসায়ন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে, “লুটপাটের উৎসবে" নামেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি পদ্ধতিগতভাবে কোম্পানির বাস্তব সম্পদ— সুতা, কাপড়, তৈরি পোশাক এবং যন্ত্রপাতি— বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কম দামে বিক্রি করেন বলে মত দেন শিল্প-সংশ্লিষ্টরা।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একজন সাবেক সিনিয়র কর্মচারী জানান, “তিনি কোম্পানি বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন না।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, “কারখানার ভেতরে গুজব ছিল, যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কম দামে এসব পণ্য বিক্রি করে কমিশন বাবদ ব্যক্তিগতভাবে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সেপ্টেম্বর নাগাদ স্থাবর সম্পদ মূলত শেষ। তখনই দৃষ্টি পড়ে নাসা গ্রুপের মুকুটের রত্নে: এর মূল্যবান জমি সম্পত্তিতে। দ্বিতীয় পর্যায়: সম্পত্তি বিক্রয়ের ফাঁদ এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের ব্যবহার: অভিযোগ আছে, একটি সুপরিকল্পিত দ্বিমুখী কৌশলে ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার শ্রমিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেন, যার মধ্যে অন্যতম অবৈতনিক কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের দাবিতে ধর্মঘটে উৎসাহিত করে একটি কৃত্রিম সংকটের পরিবেশ তৈরি করা।
সূত্র জানায়, ভাইস চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে ক্রেতা সারিবদ্ধ করে রেখেছিলেন যারা ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি প্রায় ২৫০ কোটি টাকায় কিনবেন। আর এসবের মধ্য দিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান এবং তার চক্রের লোকজন কয়েক কোটি টাকার কমিশন তৈরি করা তৃতীয় পর্যায়: আদালত কারসাজির কেলেঙ্কারি: যখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আদালত প্রাথমিকভাবে রায় দেন যে শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পত্তি বিক্রির অনুমোদন দিতে পারে না, তখন ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকার এবং তার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ভাই খোরশেদ আলম খন্দকার পরিকল্পিতভাবে পরিকল্পনা 'খ'-তে সরে যান। তাঁরা কারসাজি করে আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। আইনজীবীদের একাধিক সূত্র খোরশেদ আলম খন্দকারের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে সতর্ক করেন।
এ বিষয়ে একজন কর্পোরেট অ্যাটর্নি বলেন, “এটি ঋণ পরিশোধ নয়। এক কথায় এটি একটি সাজানো চুরি। তারা সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বিশাল জালিয়াতি পরিকল্পনায় অনিচ্ছাকৃত সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করছেন।”
এই চক্রটি নিজেদের বৃহৎ কমিশনের জন্য অবস্থান নেওয়ায় প্রকৃত স্টেকহোল্ডাররা ভোগান্তিতে পড়ছেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডে নাসা গ্রুপের ৩০ হাজার শ্রমিক মাসের পর মাস অবৈতনিক মজুরি অবস্থায় রয়েছেন। সংকট নিরসনে সরকার যে ১৫০ কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছে, তা ফেরত পাওয়া নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে
এসব বিষয়ে টেক্সটাইল সরবরাহকারীরা বলেন, “আমরা দুই বছরে ১২ কোটি টাকার কাপড় সরবরাহ করেছি। ২০২৪-এর মাঝামাঝি থেকে পেমেন্ট পাইনি। এখন শুনছি তারা অর্ধেক দামে জমি বিক্রি করছে। কিন্তু আমাদের টাকা কোথায়?”
এসব সংকট থেকে উত্তেরণে আইন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা পাঁচটি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সেগুলো হলো-
১. আদালত-নিযুক্ত স্বতন্ত্র প্রশাসক নিয়োগ
২. অক্টোবর ২০২৪ থেকে সম্পূর্ণ ফরেনসিক অডিট ৩. স্বচ্ছ মূল্যায়ন ছাড়া সম্পত্তি বিক্রয় স্থগিত
৪. বিচারিক ঘুষ ও দুর্নীতির ফৌজদারি তদন্ত
৫. ব্যাংক সরবরাহকারী-শ্রমিক সমন্বয়ে ঋণদাতা কমিটি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ বলেন, “কোম্পানি মারা যেতে পারে, কিন্তু এটিকে খুন করা কোনো সমাধান হতে পারে না।” তিনি বলেন, “এখানে যা ঘটছে, এক কথায় তা শিকারী অবসায়ন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী খোরশেদ আলম খন্দকার বলেন, "আমি কখনোই নাসা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। তবে এই ক্রাইসিস টাইমে শ্রমিকদের জন্য কিছু করা যায় কিনা তাই ভেবে কাজ করছি। এর বাইরে নাসা গ্রুপের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
তবে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নাসা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খন্দকারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মাজহারুল হক
Email: news.pratidinerbangladesh@gmail.com
ফোনঃ 01752-388928
প্রধান কার্যালয়ঃ লেভেল ১৫/এ, ১২ সোনারতরী টাওয়ার, বাংলামোটর, ঢাকা।
Copyright © 2026 প্রতিদিনের বাংলাদেশ. All rights reserved.