ঈদের পথে লাশের মিছিল: মার্চে ঝরেছে ৫৮৭
ঈদের আগে-পরের ১৫ দিনে পথে ঝরেছে ৩৫৮ প্রাণ
উচ্ছৃঙ্খলা-অবহেলায় ৩৫০১ দুর্ঘটনায় আহত ৩৮৫৯ জন
———— সেভ দ্য রোড
ঈদের আগে-পরের ১৫ দিনে ৩৫৮ সহ মার্চে সড়ক-রেল ও নৌপথে ঝরেছে ৫৮৭ জনের প্রাণ। গবেষণা-সচেতনা ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানা আরো জানান- ১৬ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সড়ক-রেল ও নৌপথে চরম নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা আর পুালিশ-প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারির অবহেলায় ছোট-বড় ৩৫০১ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮৫৯ জন। সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়- অদক্ষ ও ক্লান্ত চালকদের দ্বারা পরিচালিত বাস-ট্রাক দুর্ঘটনা অতিতের ঈদের চেয়ে যেমন বেশি ঘটেছে, তেমনি নারী ও শিশু হতাহত ও নিহতর ঘটনাও ঘটেছে বেশি। ১৯৩৭ জন নারী ও শিশু আহত এবং নিহত হয়েছেন ২৯৪ জন। ষাটোর্ধ¦ পুরুষ ৮১১ আহত এবং নিহত হয়েছেন ১১২ জন। ১৮-৫৫ বছর বয়সী পুরুষ ১১১১ আহত এবং নিহত হয়েছেন ১৮১ জন।
সেভ দ্য রোড-এর চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান মন্ডল, প্রতিষ্ঠাতা মোমিন মেহেদী, ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায় ও মহাসচিব শান্তা ফারজানাসহ সংশ্লিষ্ট গবেষণা সেল সদস্যদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক নয়াদিগন্ত, দৈনিক দিনকাল, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক কালের কন্ঠ, দৈনিক জনকন্ঠ, দৈনিক কালবেলাসহ ১৭ টি জাতীয় দৈনিক, বাংলা ভিশন, আরটিভি, জিটিভি, যমুনা নিউজ, মাছরাঙ্গা, এটিএন বাংলাসহ ২০ টিভি-চ্যানেল, জাগো নিউজ, বাংলা নিউজ, বিডিনিউজসহ ২২ টি নিউজ পোর্টাল এবং স্থানিয় প্রত্যক্ষদর্শী-সেভ দ্য রোড-এর স্বেচ্ছাসেবিগণের দেয়া তথ্যানুসারে এই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয় যে, এবার যোগাযোগ মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা ও দায়সাড়া গোছের বক্তব্যের সুযোগে গড়ে ওঠা পরিবহন সিন্ডিকেটের কাছে অতিতের চেয়ে অনেক বেশি জিম্মি হয়েছিলো সাধারণ মানুষ। শত ভাগ বেশি ভাড়া দিয়েও বাস না পেয়ে অনেককেই ট্রাকের ছাদে যেমন উঠে যেতে হয়েছে বাড়ির পথে, তেমনি যাত্রী হতে হয়েছে পিকআপের মত বিপদজনক বাহনে। সেই সাথে যোগ হয়েছিলো জ¦ালানি সংকটের বিড়ম্বনাও।
সড়ক-রেল ও নৌপথে ৩৮৫৯ টি দুর্ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩ শত ২০ কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করছেন সেভ দ্য রোড-এর গবেষণা সেল সদস্যগণ। আকাশ-সড়ক- রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য নিবেদিত দেশের একমাত্র সচেতনতা-গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়- ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিলো তৎকালিন যোগাযোগ উপদেষ্টার অবহেলা আর উশকানির পাশাপাশি বিআরটি-এর তৎকালিন চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে, সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে এই সরকারের সময়ে। কারণ অতিতের সরকারগুলোর মত এই সরকারও সড়কে ফিটনেসবিহীন বাস, ড্রাইভিং লাইসেন্সহীন চালক এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট সেক্টরে জগদ্দল পাথরের মত চেপে থাকা দুর্নীতিবাজ আমলা, মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতি-চাঁদাবাজী ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপের কারণে। সড়কে চরম নৈরাজ্য-আইন না মানার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় ক্রমশ সড়কে দূর্ঘটনা যেমন বৃদ্ধি করছে, তেমন আহত এবং নিহতের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে। এমতবস্থায় সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে সরকারি সহায়তার মাধ্যমে সমাজসচেতনতা, গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবি কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।
সেভ দ্য রোড-এর দাবি অনুযায়ী প্রতি ৩ কিলোমিটারে পুলিশ বুথ বা ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন না করা ও হাইওয়ে পুলিশসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এবারও ঈদযাত্রার ১৫ দিনে সড়কপথে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ১২২ টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৬ জন। এছাড়াও নারী শ্লীলতাহানীর ঘটনা ঘটেছে ৩১৬ টি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১ টি। যার অধিকাংশই থানা-পুলিশের স্মরণাপন্ন হয়ানি বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সেভ দ্য রোড-এর স্বেচ্ছাসেবিদের তথ্যে উঠে এসেছে।
নৌপথে কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের দায়িত্ব অবহেলার কারণে ১০২ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১০৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৫ জন। রেলপথে ২০ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১০ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৪ জন। আকাশপথে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও জ¦ালানি তেলের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে শতাধিতক হজ্জ যাত্রীসহ ২৫৬ জন যাত্রীকে চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।
আকাশ-সড়ক-রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার লক্ষ্যে গত ১৮ বছর ধরে রাজপথে থাকা স্বেচ্ছাসেবি-গবেষণা ও সচেতনতামূলক সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়- সড়কপথ, নৌপথ ও রেলপথের দুর্ঘটনামুক্ত পথ চলাচলের অধিকার রক্ষায় মালিক-শ্রমিক-প্রশাসনিক এবং সাধারণ জনগণের সমন্বয়ের কোন বিকল্প নেই বলে। পাশাপাশি সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে গত ১৮ বছর যাবৎ ৪ পথ দুর্ঘটনামুক্ত করতে সেভ দ্য রোড-এর ৭ দফা দাবি নিয়ে কাজ করছে। ৭ দফা- ১. মিরেরসরাই ট্রাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘দুর্ঘটনামুক্ত পথ দিবস’ ঘোষণা করতে হবে। ২. ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। ৩. সড়ক পথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেস বিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতিত চালক-সহযোগি নিয়োগ ও হেলপারদ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. স্থল-নৌ-রেল ও আকাশ পথ দূর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতি পূরণ সরকারীভাবে দিতে হবে। ৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সম্মৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. পথ দূর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিত করণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ সহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকল পরিবহন চালকের লাইসেন্স থাকতে হবে। ৭. ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতু সহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দূর্নীতি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে আর কোন প্রাণ দিতে না হয়।
উল্লেখ্য, ‘সেভ দ্য রোড-এর অঙ্গীকার পথ দূর্ঘটনা থাকবে না আর…’ বাক্যটিকে লালন রেখে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ২০০৭ সালে পথচলা শুরু করে আকাশ-সড়ক- রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য নিবেদিত দেশের একমাত্র সচেতনতা-গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন সেভ দ্য রোড।